Yellow Rediscovering Amphibians Blog Banner

মাইন্ডসেট – পর্ব ১

আমার এক সময় একটা সমস্যা হতো। আমার কাছে কেউ আইডি কার্ড চাইলেই মেজাজ গরম হয়ে যেতো, অপমানিত বোধ করতাম। ভাব এমন হতো যে আমার মতো মানুষের কাছে আইডি কার্ড চায় কেমন করে।

প্রায় ১৫ বছর আগের একটি ঘটনা। একবার উত্তরা থেকে মিরপুর আসতে প্রায় দুই ঘন্টা লেগে গিয়েছিলো। ঘামে পুরো শরীর ভেজা। একটি অফিসের গেট দিয়ে ঢুকতেই অল্প বয়সী এক নিরাপত্তারক্ষী মোটা গলায় আমাকে বলে আপনার আইডি কার্ড কই। আমার মাথায় পুরো আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। বলে কি? আমি কে এম হাসান রিপন, এই অফিসে প্রতিমাসে আসি, সেখানে এই ছোকড়া আমার কাছে আইডি কার্ড চায়!

মেজাজ গরম করে দিলাম একটা ধমক। পাশ থেকে আরেকজন সিনিয়র নিরাপত্তারক্ষী এসে বলল স্যার যান, মনে কিছু কইরেন না। তারপর যুদ্ধে জয়ী সেনাপতির মতো হেঁটে ভেতরে গেলাম। তারপর শুনলাম সেই অফিসে রুল জারী হয়েছে, গেট দিয়ে যেই ঢুকবে, তাকে আইডি কার্ড দেখাতে হবে।




তার কিছু দিন পর স্কলারশীপ নিয়ে অস্ট্রেলিয়া গেলাম কম্পিটেন্সি বেইজড এডুকেশনের (Competency Based Education) উপর প্রশিক্ষণ নিতে। সাথে ছিলো আরো ১০ জন দেশী ভাই ও বোনেরা। আমাদের প্রশিক্ষক ছিলেন মি. জন আর্থার। প্রথমদিন টেইফ হান্টার ইন্সটিটিউটের (TAFE Hunter Institute) গেটের কাছে আসতেই দেখী সিকিউরিটি চেকপোস্ট। এইবার আর কোন ভুল হলো না। সবাই আইডি হাতে তালুতে নিয়ে রাখলাম। বিদেশ বলে কথা।

আমি মনে মনে ভাবছি, দেখি মি. জন আর্থার কি করে। ও আল্লাহ উনি দেখী আমাদের চেয়েও একধাপ এগিয়ে। উনি আইডি কার্ড ঝুলালেন গলায়। তারপর সিকিউরিটি দরজার কাছে আসতেই বিশাল আওয়াজ করে নিরাপত্তারক্ষী হেসে বললেন “গুড মর্নিং মি. আর্থার! মি. আর্থারও হাসি দিয়ে বললেন গুড মর্নিং! তারপর আইডি দেখালেন, সাথে থাকা ব্যাগও দেখালেন। তারপর পেছন পেছন আমরাও সবাই তাই করলাম।

তারপর চলে গেলাম তিন অথবা চার তলায়। দেখি মি. জন আর্থার নেই। দাড়িয়ে আছি, হঠাৎ দেখি স্যার আসছেন একটি ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে। ট্রলির ভেতর রাখা আছে সব লার্নিং এইড (মার্কার, সাদা কাগজ, রঙিন কাগজ, স্টিকি নোট, স্কেল, প্রিন্টার মেশিন আরো কত কি) এবং সাথে রুমের চাবি। নিজে ক্লাশের দরজা খুললেন, সব লাইট জ্বালিয়ে দিলেন এবং আমাদের বসতে বললেন। তারপর টানা ৮ ঘন্টা ক্লাশ। মাঝে তিনবার দরজা খুলে দিলেন ব্রেকফাস্ট, মধ্যাহ্নভোজ এবং বিকেলের চায়ের জন্য। তারপর ঘোষনা দিলেন আজকে মতো ক্লাশ শেষ।

আমরা সবাই মহাখুশি। কিন্ত সাথে সাথে আরেকটি ঘোষনা এলো। সকালে ক্লাশে ঢুকে যেরকম পেয়েছিলাম, সেরকম রেখে ক্লাশ থেকে বের হতে হবে। ব্যাস সবাই যার যার চেয়ার ঠিক করলাম, মেঝে থেকে ময়লা উঠিয়ে নির্ধারিত বিনে রেখে দিলাম। লাইট, হিটার বন্ধ করে বের হলাম। মি. জন আর্থার দেখি বের হচ্ছেনা না। উনি একটি ফরম পূরণ করছেন। ক্লাশে এসে যা যা পেয়েছিলেন, সেগুলো আবার বুঝিয়ে দেবার জন্য ফরম পূরণ করছেন।

অস্ট্রেলিয়ার প্রথম দিনে আমার সঠিক আচরনের উপর একটি সার্টিফিকেট কোর্স করা হয়ে গেলো। ঢাকায় এসে অস্ট্রেলিয়ায় যা দেখেছি, যা পর্যবেক্ষন করেছি সব নিজের বাড়িতে, অফিসে, ক্লাশে প্রয়োগ করার চেষ্টা করলাম। আমার সহকর্মী শিক্ষকদেরও অনুরোধ করলাম। কেউ মানলেন, কেউ উপেক্ষা করলেন। যাইহোক তারাও হয়তো অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে নিজের চোখে না দেখা পর্যন্ত প্রয়োগ করবেন না বলে ভেবেছিলেন। ক্লাশে কেমন করে একজন শিক্ষার্থীকে পড়ানো হয় বা তার লার্নিং নিশ্চিত করা হয়, সে বিষয়ে আরেকটি আর্টিক্যালে লিখবো।

যাইহোক আসল কথায় আসি। পরিচয় জানতে চাইলে বা সিকিউরিটি চেক পোস্টের নিয়ম মানতে বললেই আমাদের সবার আত্মসম্মানে বেধে যায়।

  • মার্কেটের আর্চ গেট দিয়ে ঢুকতে বললে, রাগ হয়ে তাকিয়ে পাশ দিয়ে ঢুকি
  • সেদিন এয়ারপোর্টে নিরাপত্তারক্ষীর সাথে বিরাট ঝগড়া হলো যাত্রীর সাথে থাকা এক আত্মীয়ের। যেভাবেই হোক তিনি ঢুকবেন। আর নিরাপত্তারক্ষী টিকিট ছাড়া ঢুকতেই দেবে না। এদিকে দুরে দাড়িয়ে থাকা মানুষরা মুখে যা আসছে তাই বলে ভিন্নভাবে দেশের প্রশংসা করে যাচ্ছেন। আমি একজনকে বললাম ভাই ঐ গেট দিয়ে ঢুকতে হলে টিকিট দেখাতে হয়, এটাই নিয়ম। তারপরও তিনি মানবেন না।
  • ব্যাংকের কর্মকর্তা একজনকে বললেন একাউন্ট খুলতে হলে, জাতীয় পরিচয় পত্র লাগবে। ভদ্রলোক তো রেগে মাতাল। পরেরটা আর নাই বলি। একজন বুঝাচ্ছেন, অন্যজনও যুক্তি দিয়ে যাচ্ছেন।

পরিচয় পত্র এবং আত্ম অহংকার যেন এক সাথে চলে। পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয় পত্র, অফিস আইডি বা বর্তমানে মুভমেন্ট পাস, মেম্বারশীপ কার্ড, এই সব কিছু উত্তোলন করে নিজের পকেটে ঢুকিয়ে আত্ম অহংকারকে দিয়ে তালা মেরে দেই। এই তালা খোলার সাধ্য কারো নাই। এই আমরাই যখন বিদেশে যাই তখন আত্ম অহংকার নামক তালাটি দেশে রেখে যাই।

এক বড় ভাই আমার সাথে ঢাকায় ফিরছেন। প্লেনে তার সাথে আলাপ হচ্ছিলো। দেখলেন ভাই কি নিয়ম। সব জায়গায় কঠিন নিয়ম। কোন দুই নম্বরী নাই। প্রত্যেকটি জায়গায় কি সুন্দর পরিবেশ। আর আমাদের দেশে, কি আর বলবো। আমাদের প্লেনটি বাংলাদেশের মাটি ছুতেই তিনি পকেট থেকে মোবালইটি বের করে তার এক সহকারীকে ফোন দিয়ে বললেন সাথে এলইডি টিভি আছে, বের করার ব্যবস্থা কর। তারপর প্লেন থামার আগেই দাড়িয়ে হ্যান্ড ব্যাগ নামানো শুরু করে দিলেন। তারপর আমিও চুপ, তিনিও চুপ।

শুরুতেই যে অফিসের কথা বলেছি, পরে অবশ্য শুনেছি তারা সব নিরাপত্তরক্ষীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন এবং পাশাপাশি সাবাসী দিয়ে সবাইকে বলা হয় ”ধন্যবাদ তোমাদের দায়িত্ববোধের জন্য। কিন্তু বাবারা সবাইকে প্রথমেই চোর ভেবো না”।

সিকিউরিটি পোস্ট এমন একটি জায়গা যেখানে নিরাপত্তরক্ষীরা নিজেরদের ছাড়া বাকি সবাইকেই অবিশ্বাসের চোখে দেখে। আর দেশের মানুষরা নিজেদের ছাড়া সব চেকপোস্টকেই আত্ম অহংকারের চোখ দিয়ে দেখে। আমার মনে হয় পরিচয় পত্র দেখতে চাওয়া এবং পরিচয় পত্র দেখাতে পারার মধ্যে সামান্য একটু ফাঁক আছে। যেটা পূরণ করতে পারলেই আর আত্ম অহংকার ঢুকবার জায়গা পাবে না। ইন শা আল্লাহ এই ফাঁকটিও আমরা বন্ধ করতে পারবো এবং ফেসবুকের ভাইরাল ভিডিও থেকেও মুক্তি পাবো।

লেখক

K M Hasan Ripon, Executive Director, BSDI

Email: kmhasan.ripon@gmail.com

3 Responses

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked*